ঈসার কাছে একটি ইঞ্জিল, নাকি তার অনুসারীদের কাছে চারটি ইঞ্জিল?

“কোরআন শরীফে হযরত ঈসার কাছে নাজিলকৃত একটি ইঞ্জিলের কথা বলা হয়, কিন্তু বর্তমান ইঞ্জিল লিখেছেন তার সাহাবীরা”

এই অভিযোগের মধ্যে চারটি প্রশ্ন আছে:

কোরআন শরীফে যেমন বলা হয়, ঈসা মসীহ্‌ সত্যই “ইঞ্জিল” (অর্থাৎ সুসংবাদের বাণী) পেয়েছিলেন, কিন্তু সেটা ঈসার জীবনকালে একটি বই ছিল না বরং একটি বাণী বা শিক্ষা। সেই শিক্ষা “ইঞ্জিল” কিতাবের মধ্যে পাওয়া যায়।

হযরত ঈসা এবং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) উভয়ই নিজে কোন কিতাব লিখে রাখেননি, যদিও বর্তমান কাল অনেকে এমনভাবে কথা বলে থাকেন। তাদের মৃত্যুর পরে সাহাবীগণ তাদের কিতাব লিখে রেখেছেন।

হযরত ঈসার ইঞ্জিল শরীফ একটু ভিন্নভাবে নাজিল হয়েছে। অধিকাংশ নবীদের ক্ষেত্রে, যেমন হযরত ইশাইয়া (আঃ) এবং হযরত ইয়ারমিয়া (আঃ), আল্লাহ্‌ তাদের কাছে একটি বিশেষ বাণী নাজিল করেছেন “আল্লাহ্‌র কালাম” হিসাবে, এবং তাই সেই নবীর কিতাব হল সেই লিখিত আল্লাহ্‌র বিশেষ বাণী।

কিন্তু ইঞ্জিল কোরআন উভয় গ্রন্থে যেমন বলা হয়েছে, হযরত ঈসা হচ্ছেন নিজেই একক “আল্লাহ্‌র বাণী,” অর্থাৎ তিনি নিজেই ছিলেন প্রধান বাণী।

অন্যান্য নবীরা লিখিত বাণী (“আল্লাহ্‌র কালাম”) নিয়ে আসলেন, কিন্তু হযরত ঈসার ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। তিনি নিজেই আল্লাহ্‌র জীবন্ত বাণী ছিলেন, এবং এইজন্য তার কিতাব (ইঞ্জিল) অপ্রধান, বরং হযরত ঈসাই প্রধান বাণী। ইঞ্জিল কিতাব হচ্ছে সেই জীবন্ত আল্লাহ্‌র বাণীর জীবন ও শিক্ষা সম্পর্কে পাক-রূহের পরিচালনায় লিখিত সাক্ষীদের পবিত্র লিখিত বর্ণনা। হযরত ঈসা নিজেই তার সাহাবীদের এমন দায়িত্ব দিয়ে গেলেন, যেন তারা দুনিয়ার কাছে তার জীবন ও সমস্ত শিক্ষা সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয় (ইঞ্জিল, মথি ২৮:১৮-২০)। তিনি আবার প্রতিজ্ঞা করলেন যে পাক রূহ্‌ নিজেই তার শিক্ষা সম্বন্ধে সাহাবীদের মনে করিয়ে দেবেন (ইউহোন্না ১৪:২৬)। আল্লাহ্‌র জীবন্ত কালাম সম্পর্কে এই পবিত্র বাণী সংরক্ষণ করার উদ্দেশ্যে, মসীহ্‌র বারজন উম্মত এবং তাদের সঙ্গীরা পাক-রূহের পরিচালনায় মসীহ্‌র জীবন-চরিত এবং শিক্ষা লিখে রাখলেন ইঞ্জিল কিতাব হিসাবে।

ইঞ্জিলের শব্দার্থ

তাহলে “ইঞ্জিল” সম্পর্কে আমরা কোরআনে কী ধারণা পাই? কোরআনের ব্যাখ্যাকারীগণ একবাক্যে বলেন যে ‘ইঞ্জিল’ (اِنْجِيل) শব্দটা আরবী ভাষা নয় বরং গ্রীক ঈসায়ী শব্দ εὐαγγέλ (এউয়াঞ্জেল, অর্থাৎ “গসপেল”)-এর একটা অনুবাদ, যার ইংরেজী হল ‘gospel’। তাই ‘ইঞ্জিল’-এর প্রকৃত শব্দার্থ জানতে হলে সেই শব্দের তখনকার চলতি ব্যবহার জানতে হবে। আর কোরআনের অনেক আগে থেকে আজ পর্যন্ত এই اِنْجِيل / εὐαγγέλ/gospel বোঝানো হয়েছে শুধু একটি গ্রন্থ।

প্রথম ঈসায়ী জামাতের কাছে এবং কোরআন শরীফে এই ‘ইঞ্জিল’ শব্দের তিনটি সমান্তরাল অর্থ ছিল-

  1. হযরত ঈসার বাণী – আক্ষরিক অর্থে, ‘ইঞ্জিল’-এর শব্দার্থ ‘সুখবর’। হযরত ঈসার ক্ষেত্রে বোঝানো হচ্ছে নাজাত এবং আল্লাহ্‌র রাজ্য সম্পর্কে হযরত ঈসার সুখবর।
  2. হযরত ঈসার জীবনী- ‘ইঞ্জিল’ আবার বোঝায় ঈসার জীবন সম্পর্কে একটি লিখিত বর্ণনা, যেমন মথি, মার্ক, লুক এবং ইউহোন্না, যেগুলো প্রথম থেকেই একসঙ্গে চারখণ্ডে বলা হত “ইঞ্জিল”।
  3. ঈসায়ী কিতাব – তৃতীয়তঃ “ইঞ্জিল” বোঝানো হত ২৭ খণ্ডে সেই পুরো ঈসায়ী কিতাবখানা, যাকেও বলা হয় ‘নতুন নিয়ম’ বা New Testament

‘খুলনা’ শব্দের যেমন পাশাপশি তিনটি আলাদা সঠিক শব্দার্থ আছে (একটি শহর, জেলা, ও বিভাগ), তেমনভাবে ‘ইঞ্জিল’ বোঝায়, ১) ঈসার মূল বাণী, ২) সেই জীবন্ত বাণীর একটি লিখিত দলিল, ৩) সেই বাণী সম্পর্কে পুরো কিতাব।

ইঞ্জিল সম্পর্কে কোরআন

যখন কোরআনে বলা হয় যে ঈসার কাছে ইঞ্জিল দেওয়া হল, সেখানে বোঝানো হচ্ছে ‘ইঞ্জিল’-এর প্রথম শব্দার্থ, নাজাত এবং আল্লাহ্‌র রাজ্য সম্পর্কে তার ‘সুসংবাদের বাণী’। এই অর্থ তিনি যেমন আল্লাহ্‌র কাছে তৌরাত এবং ‘হিকমত’ শিখেছেন (মায়িদা ৫:১১০), তেমনভাবে তিনি ইঞ্জিল অর্থাৎ আল্লাহ্‌র সুখবরের বাণীও শিখেছেন বা তার কাছে “নাজিল হয়েছে”। ইসলামী ইতিহাস থেকে আমরা জানি যে ইসলামের প্রথম যুগে মুসলমানগণ একমত ছিলেন যে ‘ইঞ্জিল’ বলতে খ্রীষ্টানদের কাছে সংরক্ষিত কিতাবটিকে বোঝায়, এবং সেই কিতাবের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে অনেক প্রমাণ রয়েছে।

চারটা সমাচারে এক

দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে ঈসায়ী জামাতের মধ্যে ‘ইঞ্জিল’ শব্দ দিয়ে বোঝানো হত মথি, মার্ক, লূক এবং ইউহোন্না একসঙ্গে সেই চারটি ইঞ্জিল। বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ F.F. Bruce বলেন—

খুব প্রাথমিক কাল থেকে এই চারটি গসপেল এক সংকলনে যুক্ত করা হয়েছিল। ইউহোন্না লিখিত সুখবর লেখার পরপরই সেগুলো একত্র করা হল। এই চারখণ্ড সংকলন প্রথম থেকেই বলা হত ‘গসপেলটি’ একবচন, ‘গসপেলগুলো’ বহুবচন নয়; শুধু চার খণ্ডে বর্ণিত একটাই গসপেল ছিল, ‘মথি অনুসারে রচিত’ অথবা ‘মার্ক অনুসারে রচিত’ সেভাবে বিভক্ত।

তাই হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) এর জীবনকালে ‘ইঞ্জিল’ দিয়ে বোঝানো হত সেই চারটি ইঞ্জিল (মথি, মার্ক, লূক, ইউহোন্না) অথবা পুরো ইঞ্জিল শরীফ কিতাবের ২৭টি খণ্ড। হযরত পিতর বলেছেন—

আমাদের হযরত ঈসা মসীহের শক্তি ও তাঁর আসবার বিষয় তোমাদের কাছে জানাতে গিয়ে আমরা কোন বানানো গল্প বলি নি; আমরা তাঁর মহিমা নিজেদের চোখেই দেখেছি। তবে সব কিছুর উপরে এই কথা মনে রেখো যে, কিতাবের মধ্যেকার কোন কথা নবীদের মনগড়া নয়, কারণ নবীরা তাঁদের ইচ্ছামত কোন কথা বলেন নি; পাক-রূহের দ্বারা পরিচালিত হয়েই তাঁরা আল্লাহ্‌র দেওয়া কথা বলেছেন। (ইঞ্জিল শরীফ, ২ পিতর ১:১৬; ২০-২১)।

আবার বলা হয়েছে—

পাক-কিতাবের প্রত্যেকটি কথা আল্লাহ্‌র কাছ থেকে এসেছে এবং তা শিক্ষা, চেতনা দান, সংশোধন এবং সৎ জীবনে গড়ে উঠবার জন্য দরকারী, যাতে আল্লাহ্‌র বান্দা সমপূর্ণভাবে উপযুক্ত হয়ে ভাল কাজ করবার জন্য প্রস্তুত হতে পারে। (২ তীমথিয় ৩:১৬-১৭)

সেইজন্য এই শিক্ষা যে অগ্রাহ্য করে সে মানুষকে অগ্রাহ্য করে না, বরং যিনি তাঁর পাক-রূহ্‌কে তোমাদের দান করেছেন সেই আল্লাহ্‌কেই অগ্রাহ্য করে। (১ থিষলনিকীয় ৪:৮)


অন্যান্য সম্পর্কিত প্রবন্ধ:

 

  1. হযরত ঈসা মসীহ্‌ যে কোরআন অনুযায়ী একমাত্র আল্লাহ্‌র কালাম, তার জন্য দেখুন পৃষ্ঠা XX।
  2. আরবী ক্রিয়া ‘নাজেল’ দিয়ে শুধু নবীর কাছে প্রেরিত কিতাব বোঝায় না, বরং এর সাধারন অর্থ হল আল্লাহ্‌র কাছ থেকে যেকোন দান। সূরা হাদীদের ২৫ আয়াতে এই ‘নাজেল’ শব্দ লোহারের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়েছে, “আর আমি নাযিল করেছি লৌহ, যাতে আছে প্রচন্ড রণশক্তি এবং মানুষের বহুবিধ উপকার।” (সূরা হাদীদ ৫৭:২৫)
  3. F.F. Bruce, The New Testament Documents: Are They Reliable? (Intervarsity Press; Downers Grove Il, 1992), p.23.

কোনো প্রশ্ন বা মন্তব্য থাকলে আমরা শুনতে চাই! নিচের ফর্ম দিয়ে যোগাযোগ করুন:

Enable javascript in your browser if this form does not load.

Leave a Reply

Your email address will not be published.