হযরত ঈসা মসীহের পরিচয়

ঈসা মসীহ্‌ কে?

আহল-ই-কিতাব-বিশ্বাসীদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হল মরিয়ম-তনয় ঈসা মসীহ্‌ (আঃ)-কে নিয়ে এবং তার সঠিক পরিচয়। যেমন ধরেন, জাকির নায়েক এবং আহ্‌মেদ দীদাতের মত কিছু মুসলমান সহজে ঈসাকে কুমারী-মেয়ে জন্মিত ‘মসীহ্‌’ হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু খ্রীষ্টানদের ভুলপ্রমাণ করার জন্য তাদের বিরুদ্ধে তারা প্রচুর চেষ্টা করে, কারণ তারা মনে করা যে খ্রীষ্টানরা ‘তিন আল্লাহ্‌ বিশ্বাস করে’ এবং যে ঈসা মসীহ্‌ ক্রুশে মারা যাননি। আবার ইহুদীগণ সহজে গ্রহণ করে যে মসীহ্‌ ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু তিনি যে কুমারী-মেয়ে জন্মিত ‘মাসীহ্‌’ ছিলেন তা এরা গ্রহণ করতে পারে না। এমনকি খ্রীষ্টানদের মধ্যেও ঈসার সঠিক পরিচয় নিয়ে অনেক তর্ক বিতর্ক হয়েছিল।

এতো মতের অমিলের স্পষ্ট কারণ হল যে হযরত ঈসা অনন্য, তিনি পৃথিবীর অন্যান্য মানুষদের মত না। তার জন্ম, শিক্ষা, কাজ, অলৌকিক ঘটনা, এবং মৃত্যু—সবই অনন্য। তাই এতো বিস্ময়কর মানুষের পরিচয় নিয়ে বিতর্ক করা স্বাভাবিক।

এই আলোচনায় আমি দার্শনিকদের অর্থহীন তর্কযুদ্ধের ফাঁদ এড়াতে চাই। যেমন ‘ত্রিত্ববাদ’-এর মত শব্দ নিয়ে প্রচণ্ড তর্কাতর্কি হয়েছে, যদিও সেই শব্দ ইঞ্জিলে নাই। কিতাবে অনুপস্থিত শব্দ নিয়ে তর্ক না করে আমি বরং ঈসার বিষয়ে বিভিন্ন কিতাবে যা যা বলা হয় তার উপর লক্ষ্য করব। বিভিন্ন কিতাব থেকে, বিশেষ করে ইঞ্জিল থেকে, আমি ঈসা মসীহের পরিচয় এবং কাজ সম্বন্ধে একটি স্পষ্ট ছবি উপস্থাপন করতে চাই।

আল্লাহ্‌ এক

এই তদন্তের আরম্ভ বা ভিত্তি হল সকল আহলে-কিতাবীদের সেই স্বীকৃত মূল সত্য, আল্লাহ্‌র একতা। সকল কিতাবী লোক একমত যে মাত্র একজন আল্লাহ্‌ আছেন, যিনি সৃষ্টিকর্তা, চিরন্তন, অপরিবর্তনীয়, সর্বশক্তিমান এবং সর্বজ্ঞ। এই হল তৌরাত, জবুর, নবীদের কিতাব, ইঞ্জিল এবং কোরআনের স্পষ্ট সাক্ষ্য এবং আমাদের ঈমানের ভিত্তি।

উদাহরণস্বরূপ, যখন একজন ইহুদী আলেম হযরত ঈসাকে জিজ্ঞাসা করল কোন্‌ হুকুম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তিনি বলেছিলেন:

জবাবে ঈসা বললেন, “সবচেয়ে দরকারী হুকুম হল, ‘বনি-ইসরাইলরা, শোন, আমাদের মাবুদ আল্লাহ্‌ এক। তোমরা প্রত্যেকে তোমাদের সমস্ত দিল, সমস্ত প্রাণ, সমস্ত মন এবং সমস্ত শক্তি দিয়ে তোমাদের মাবুদ আল্লাহ্‌কে মহব্বত করবে।’ (মার্ক ১২:২৯,৩০)

তাঁর স্পষ্ট সাক্ষ্য হল যে আল্লাহ্‌ এক। অথবা ইঞ্জিলের অন্য জায়গায় এই ভাবে লেখা আছে—

আল্লাহ্ মাত্র একজনই আছেন এবং আল্লাহ্ ও মানুষের মধ্যে মধ্যস্থও মাত্র একজন আছেন। সেই মধ্যস্থ হলেন মানুষ মসীহ্ ঈসা। (১ তীমথিয় ২:৫)

একজন অদ্বিতীয় নবী

তাহলে প্রশ্ন উঠে, যদি সকল কিতাবীগণ তাই বিশ্বাস করে, তাহলে হযরত ঈসা মসীহ্‌কে নিয়ে এতো বিতর্ক কেন হয়? যেমন হযরত ইবরাহিম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ), হযরত দাউদ (আঃ)-এর মত অন্যান্য নবীদের বিষয়ে অনেক মিল আছে। সবাই স্বীকার করে যে আল্লাহ্‌ তাদেরকে ডেকেছেন এবং তাদের সময়কার লোকদের জন্য একটি বাণী দিয়েছিলেন। তাহলে ঈসা মসীহ্‌কে নিয়ে এমন মতের মিল নেই? উত্তরটা হল এই যে, যদিও কিছু দিক দিয়ে তিনি অন্যান্য নবীদের মত, কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক দিয়ে তিনি অনন্য এবং অন্যরকম। ঈসার এই ভিন্নতার কারণেই তাকে নিয়ে এতো মতামত দেখা দিয়েছে। এই প্রবন্ধে আমি সংক্ষিপ্ত এবং ধারাবাহিক ভাবে দেখাতে চাই হযরত ঈসা মসীহের বিষয় বিভিন্ন কিতাব কী বলে। তার অলৌকিক চিহ্ন, তার কর্তৃত্ব, তার স্বভাব, নিজের বিষয়ে তার দাবিগুলো, এবং শেষে কিতাবে তার বিভিন্ন নাম ও উপাধি আমরা দেখব।

হযরত ঈসার অদ্বিতীয় কেরামতী কাজ

প্রথমত, তিনি আগের ও পরের সকল নবীদের তুলনায় অনেক বেশী কেরামতী কাজ দেখিয়েছিলেন। আগেকার কিতাবে তার এই চিহ্নগুলো ভবিষ্যদ্বানী করা হয়েছে। নবীদের কিতাবে বলা হয়েছে যে তাঁর আশ্চর্য কেরামতী কাজ দিয়ে আল্লাহ্‌র মসীহের চিনা যাবে, এবং এই চিহ্নের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। ইঞ্জিল শরীফে এই কেরামতীর বিস্তারিত বর্ণনা আছে এবং কোরআন শরীফে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে যেমন সূরা আলে-‘ইমরান ৩:৪৯ আয়াতে এবং মায়িদা ৫:১১০। সূরা আলে-‘ইমরানে বলা হয়েছে:

‘এবং তাহাকে বনী ইসরাঈলের জন্য রাসূল করিবেন।‘ সে বলিবে, ‘আমি তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হইতে তোমাদের নিকট নিদর্শন লইয়া আসিয়াছি। আমি তোমাদের জন্য কর্দম দ্বারা একটি পক্ষীসদৃশ আকৃতি গঠন করিব; অতঃপর ইহাতে আমি ফুৎকার দিব; ফলে আল্লাহ্‌র হুকুমে উহা পাখি হইয়া যাইবে। আমি জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্তকে নিরাময় করিব এবং আল্লাহ্‌র হুকুমে মৃতকে জীবন্ত করিব। তোমরা তোমাদের গৃহে যাহা আহার কর ও মওজুদ কর তাহা তোমাদেরকে বলিয়া দিব। তোমরা যদি মু’মিন হও তবে ইহাতে তোমাদের জন্য নিদর্শন রহিয়াছে।’ (সূরা আলে-‘ইমরান ৩:৪৯)

ঈসা মসীহের সকল কেরামতী কাজ দেখার সময় নাই, কিন্তু তাঁর কিছু কিছু কেরামতী আমি উল্লেখ করব।

একদিন হযরত ঈসা এবং তার সাহাবীগণ গালীল সাগরের মাঝখানে একটি ভীষণ ঝড়ের মধ্যে আটকে গেল। তার সাহাবীরা ভীষণ ভয় পেয়ে মনে করত যে নিশ্চয় তারা ডুবে যাবে। কিন্তু সাহাবীদের সামনে হযরত ঈসা ঠান্ডা ভাবে বাতাস ও সাগরকে ধমক দিলেন, এবং হঠাৎ করে সব কিছু খুব শান্ত হয়ে গেল। এতে সাহাবীরা আশ্চর্য হয়ে বললেন, “ইনি কি রকম লোক যে, বাতাস এবং সাগরও তাঁর কথা শোনে!” (মথি ৮:২৭)। আমরা যদি এই ঘটনা নিয়ে একটু গভীরভাবে চিন্তা করি, তাহলে আমাদেরও একই প্রশ্ন হয়। অন্য একদিন ঈসা একটি নিষ্ফল গাছকে ধমক দিলেন এবং সেটা সরাসরি শুকিয়ে গেল (মথি ২১:১৮-১৯)। প্রকৃতির উপরে তার ক্ষমতার আরও উদাহরণ দেওয়া যায়।

রোগ এবং জিনের উপর হযরত ঈসার ক্ষমতা

বিভিন্ন রকম রোগ সুস্থ করার মধ্য দিয়ে হযরত ঈসা আবার অসুখের উপর তার ক্ষমতা দেখিয়েছিলেন। চর্মরোগী, অবশ-রোগী ও খোঁড়াদের তিনি সুস্থ করলেন, এবং তার হুকুমে বধির ও অন্ধদের শুনতে ও দেখতে পেল। হযরত ঈসার তিন বছর তবলিগের সময় ধরে চারদিক থেকে অনেক ইহুদী এবং অইহুদী রোগী তার কাছে ভির করে আসল এবং তিনি তাদের সবাইকে সুস্থ করলেন।

তেমনই ভাবে হযরত ঈসা শয়তান এবং বদ-রূহ্‌দের উপর তার কর্তৃত্ব প্রকাশ করেছিলেন। যারা দীর্ঘদিন শয়তানের অত্যাচার ভুগছিলেন, তাদের ভিতর থেকে হযরত ঈসা মন্দ-আত্মাদের ছাড়াতেন। এই কর্তৃত্বের জন্য তিনি এতো বিখ্যাত হয় গেলেন যে যারা মসীহ্‌র অনুসারী নয় তারাও ঈসার নামেই মন্দ-আত্মাদের ছাড়াতে চেষ্টা করতে লাগলেন।

আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় খাবার এবং পানির উপরও তিনি তার ক্ষমতা দেখিয়েছিলেন। ইউহোন্না ৬ অধ্যায়ে বর্ণিত আছে কীভাবে একবার একটি নির্জন জায়গায় তিনি হাজার হাজার লোকদের শিক্ষা দিচ্ছিলেন, এবং খাবারের সময় সেখানে কোন খাবার ছিল না এমনকি খাবার কিনে নেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল না। শুধুমাত্র একটি ছেলের কাছে চারটা ছোট রুটি এবং দু’টি মাছ ছিল। কিন্তু ঈসা মসীহ্‌ সেই ছেলের খাবার তুলে নিয়ে আল্লাহ্‌কে শুকরিয়া জানালেন এবং সাহাবীরা তা লোকদের দিলেন। সেদিন পাঁচ হাজার লোক সেই খাবার থেকে পেট ভরে খেল এবং খাওয়ার পরে যে টুকরাগুলো পড়ে রইল তাতে বারোটা টুকরি পূর্ণ হল।

মৃত্যুর উপর ঈসার ক্ষমতা

শেষে, মানব জাতির মূল শত্রু মৃত্যুর উপরও তিনি তার ক্ষমতা প্রকাশ করেছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তার হুকুমে একটা মরা মানুষ আবার জীবিত হয়ে উঠল। উদাহরণস্বরূপ ইউহোন্না ১১ অধ্যায়ে বলা হয়েছে যে হযরত ঈসার বন্ধু লাসার হঠাৎ করে মারা গেলেন। যদি মসীহ্‌ লাসারের অসুখ সম্বন্ধে আগ থেকে জানতেন, তবুও লাসারের মারা যাওয়ার ও কবর দেওয়ার তিন দিন পরেই তিনি লাসারের গ্রামে গেলেন। সেখানে এসে ঈসা মসীহ্‌ সেই কবরের কাছে গিয়ে কবরের উপর যে পাথর ছিল তা সরিয়ে দিতে বলল। তাতে লোকেরা প্রতিবাদ করে বলল যে চার দিন হল সে মারা গেছে বলে দুর্গন্ধ হবে। কিন্তু পাথর সরিয়ে দেওয়া হল এবং ঈসা জোরে ডাক দিয়ে বললেন, “লাসার, বের হয়ে এস”। সবাই আশ্চর্য হয়ে দেখল যিনি মারা গিয়েছিলেন সেই লাসার কবরের কাপড় পরে জীবিত এবং সুস্থ অবস্থায় কবর থেকে বের হয়ে আসলেন।

গুনাহ্‌ মাফ করার ক্ষমতা

আল্লাহ্‌র দেওয়া এই কেরামতী কাজ করার ক্ষমতা হযরত ঈসার আসল পরিচয় সম্বন্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত ছিল। তেমনই ভাবে তিনি এমন আরেকটি আশ্চর্য কর্তৃত্ব দেখিয়েছিলেন যা কোন মানুষ আগে কখনও করি নি। তার বিভিন্ন অধিকারের দাবির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল তার গুনাহ্‌ মাফ করার দাবি। এমন একটি ঘটনা পাওয়া যায় মার্ক ২:১-১২ আয়াতে যখন একজন অবশ-রোগী ঈসার কাছে নিয়ে যাওয়া হল এবং তার ঈমান দেখে হযরত ঈসা সেই অবশ-রোগীকে বললেন, “বাছা, তোমার গুনাহ্ মাফ করা হল।” এতে ইহুদী ধর্মীয় নেতারা রেগে গেলেন, কারণ তারা ভাবছিলেন যে একমাত্র আল্লাহ্‌কে ছাড়া কারো গুনাহ্‌ মাফ করার অধিকার নাই। এর উত্তরে হযরত ঈসা সবাইকে বলল যে তার গুনাহ্‌ মাফ করার দাবির সততা প্রমাণ করার জন্য তিনি সেই অবশ-রোগীকে সুস্থ করবেন। তখন ঈসা তাকে উঠে হেটে যাওয়ার হুকুম দিলেন এবং যিনি জন্ম থেকে পঙ্গু ছিল সেই অবশ-রোগী হেঁটে বেড়াল।

শান্তিদাতা

হযরত ঈসার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃত্বের দাবি হচ্ছে যে তিনি তার অনুসারীদের শান্তি দিতে পারেন। যেমন তিনি তার অনুসারীদের একবার বলেছিলেন—

“আমি তোমাদের জন্য শান্তি রেখে যাচ্ছি, আমারই শান্তি আমি তোমাদের দিচ্ছি; দুনিয়া যেভাবে দেয় আমি সেইভাবে দিই না। তোমাদের মন যেন অস্থির না হয় এবং মনে ভয়ও না থাকে।” (ইউহোন্না ১৪:২৭)

দুনিয়ার শান্তি অস্থায়ী এবং অপূর্ণ, কিন্তু ঈসা মসীহ্‌ যে শান্তি দেন সেটা স্থায়ী এবং পরিপূর্ণ। এইজন্য ঈসা মসীহ্‌র অনুসারীগণ তার নামের উল্লেখে ‘তার উপর শান্তি বর্ষিত হোক’ দোয়াটা আবৃত্তি না। দুটি কারণে সেটা ঈসার ক্ষেত্রে অর্থহীন হয়। প্রথমত, কোরআন এবং ইঞ্জিল থেকে আমরা জানি যে হযরত ঈসা এখনই আল্লাহ্‌তা’আলার কাছে সম্মান, কর্তৃত্ব এবং শান্তির জায়গায় আছে (যেমন সূরা আলে-ইমরান ৩:৪৫)। আমাদের দোয়ার জন্য তার কোন দরকার নেই। দ্বিতীয়ত, আমরা তাকে শান্তি দিই না বরং তিনিই আমাদের শান্তি দেন।

কিয়ামতে হযরত ঈসার বিচার

মৃত্যুদের জীবন দেওয়ার সাথে সম্পর্কিত মসীহের আরেকটি ক্ষমতা হল শেষ বিচারে মৃতদের বিচার করার জন্য তার কর্তৃত্ব। সূরা যুখ্‌রুফ ৪৩:৬১ আয়াতে এর ইঙ্গিত আছে যখন বলা হয় যে ঈসা মসীহ্‌ হলেন ‘কিয়ামতের নিশ্চিত নিদর্শন’। এই ‘নিদর্শন’-এর বিস্তারিত বর্ণনা ইঞ্জিলে আছে যে ঈসা মসীহ্‌ কিয়ামতে দুনিয়াতে ফিরে এসে সমস্ত জাতিদের বিচার করে জান্নাতি এবং জাহান্নামীদের ভাগ করবেন (মথি ২৫:৩১-৩২)।

ঈসা মসীহের এই শেষ দুটি ক্ষমতা সম্ভবত সবচেয়ে বোঝা কঠিন কারণ সেগুলি এতো আশ্চর্যজনক। এগুলো সঠিক ভাবে বোঝার জন্য আগে কিছুক্ষণ হযরত ঈসার আরও গুণাবলি এবং নাম বিশ্লেষণ করা উচিত। আমি এখন মাত্র দুটি উল্লেখ করব যেগুলি হল—

  • সবকিছু সৃষ্টি করার অধিকার, এবং
  • সবকিছু চালিয়ে যাওয়ার অধিকার

এগুলিতে আমরা কিছুক্ষণ পরে ফিরে আসব।

এতো ব্যতিক্রমী কেন?

এর মধ্যে হযরত ঈসার বিভিন্ন কেরামতী কাজ আমরা দেখেছি এবং তার বিভিন্ন কর্তৃত্ব বা অধিকারও দেখেছি। অন্যান্য সকল মানুষের কাজ এবং অধিকার থেকে এগুলো অনেক আলাদা। তাহলে প্রশ্ন উঠে, তিনি কেন এতো ব্যতিক্রমী? তার আগে যেসব নবী-পয়গম্বর এসেছিলেন তিনি কি তাদের মত নন? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে তৃতীয় একটি বিষয় দেখা দরকার, তার স্বভাব। এবং এই ক্ষেত্রেও আমরা দেখি যে ঈসা মসীহ্‌ অন্যন্য।

কুমারী মায়ের গর্ভে জন্ম হওয়ার রহস্য

প্রথমত সকল মানুষের মধ্যে একমাত্র ঈসা মসীহ্‌ বিনা পিতায় জন্মগ্রহণ করেছেন। আলীর ছেলে ইউসুফের সঙ্গে ঈসার মা মরিয়মের বিয়ের কথা ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের আগে আল্লাহ্‌র পাক-রূহের ক্ষমতায় বিবি মরিয়ম গর্ভবতী হলেন। ইঞ্জিল শরীফের মথি ১:১৮, লূক ১:২৯-৩৫, এবং কোরআন শরীফে সূরা আলে-‘ইমরান এবং মার্‌ইয়ামে এর বর্ণনা আছে।

দ্বিতীয় আদম

হযরত ঈসার আশ্চর্যজনক জন্ম এবং জীবনের কারণে বিভিন্ন কিতাবে তাকে হযরত আদম (আঃ)-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়। যেমন সূরা আলে-‘ইমরানে লেখা আছে—

আল্লাহ্‌র নিকট নিশ্চয়ই ‘ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের দৃষ্টান্তসদৃশ। তিনি তাহাকে মৃত্তিকা হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন; অতঃপর উহাকে বলিলেন ‘হও’, ফলে সে হইয়া গেল। (আলে-‘ইমরান ৩:৫৯)

ইঞ্জিল শরীফেও হযরত ঈসা এবং হযরত আদমের একই তুলনা করা হয়। আমরা সেখানে দেখি যে হযরত আদমের অবাধ্যতার ফলে যা ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে তা হযরত ঈসার বাধ্যতার ফলে আবার ঠিক করা হয়েছে। বলা হয়েছে—

তাহলে একটা গুনাহের মধ্য দিয়ে যেমন সব মানুষকেই শাস্তির যোগ্য বলে ধরা হয়েছে, তেমনি একটা ন্যায় কাজের মধ্য দিয়ে সব মানুষকেই ধার্মিক বলে গ্রহণ করবার ব্যবস্থাও করা হয়েছে এবং তার ফল হল অনন্ত জীবন। যেমন একজন মানুষের অবাধ্যতার মধ্য দিয়ে অনেককেই গুনাহ্ গার বলে ধরা হয়েছিল, তেমনি একজন মানুষের বাধ্যতার মধ্য দিয়ে অনেককেই ধার্মিক বলে গ্রহণ করা হবে।” (রোমীয় ৫:১৮-১৯)

একমাত্র নিষ্পাপ নবী

তার অলৌকিক জন্মের ফলে হযরত ঈসা জন্ম থেকেই পুরোপুরি নিষ্পাপ ছিলেন (সূরা আলে-‘ইমরান ৩:৪৬ এবং মার্‌ইয়াম ১৯:১৯)। অন্যান্য সকল মানুষ আদিপিতা হযরত আদমের সন্তান হয়ে তার তার কাছ থেকে একটি গুনাহের স্বভাব উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি। হাবিল ও কাবিলের মত আমাদের স্বার্থপর কামনা-বাসনা পূরণ করার জন্য আমাদের ভিতরে হিংসা, রাগ এবং অহংকার থাকে। হযরত ঈসাকে ছাড়া পৃথিবীর সকল মানুষ, এমনকি নবীগণও হযরত আদমের কাছে এই গুনাহের প্রবণতা পেয়েছে। এইজন্য আমাদের দুনিয়া এবং সংবাদপত্রে এতো মারামারি, ঘৃণা, খুন এবং গুনাহ্‌ দেখা যায়।

এইজন্যও আল্লাহ্‌র নাজিলকৃত বিভিন্ন কিতাবে নবীদের গুনাহ্‌ এতো পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। আল্লাহ্‌ সেগুলো ঢেকে বা লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করে নি কারণ তাঁরাও অন্যান্য মানুষদের মত আদমের সন্তান। এবং এইজন্য কোরআন শরীফে নবীদের আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করার হুকুম দেখা যায় যেমন সূরা বাকারা ২:৩৬-৩৭; সূরা আ’রাফ ৭:১৯-২৩; হুদ ১১:৪৭; সূরা শু’আরা ২৬:৮২; সূরা কাসা ২৮:১৫-১৬; সূরা সাফ্‌ফাত ৩৭:১৩৯-১৪৬; সূরা সাদ ৩৮:২৪-২৫; সূরা মু’মিন ৪০:৫৫; সূরা মুহাম্মদ ৪৭:১৯; সূরা ফাত্‌হ্‌ ৪৮:১-২। সূরা আ’রাফে যেমন হযরত আদম বলেছিলেন—

“হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করিয়াছি, যদি তুমি আমাদেরকে ক্ষমা না কর এবং দয়া না কর তবে তো আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হইবে” (সূরা আ’রাফ ৭:২৩)

এর একমাত্র ব্যতিক্রম হচ্ছে ঈসা আল-মসীহ্‌। পাক-রূহের কুদরতীতে বিনা পিতায় জন্মিত, তিনি একটি পবিত্র এবং নিষ্পাপ জীবন যাপন করেছিলেন। এটা কোরআন এবং ইঞ্জিলে সুস্পষ্ট। সূরা মরিয়ম ১৯ আয়াতে, আল্লাহ্‌র ফেরেশতা জিবরাইল মরিয়মের কাছে বলল যে তার সন্তান হবে ‘পবিত্র’ বা ‘নিষ্পাপ’ (زَكِيًّا জাকীয়্‌ )। ইঞ্জিলের শিক্ষার সঙ্গে এটা মিলে যায়, যেখানে বলা হয়েছে যে তিনি ‘গুনাহ্‌ করেন নি’ (ইবরানী ৪:১৫)। ঈসা মসীহ্‌ নিজেই বলেছিলেন, যখন ইহুদী আলেমগণ তাকে সমালোচনা করছিলেন, যে “আপনাদের মধ্যে কে আমাকে গুনাহ্‌গার বলে প্রমাণ করতে পারেন?” (ইউহোন্না ৮:৪৬)। তার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতে পারলেন না।

এমনকি সাহীহ্‌ হাদিসেও ঈসা মসীহ্‌র নিষ্পাপ স্বভাব সমর্থন করে—

– হযরত আবূ হুরায়রা (রা) সূত্রে রাসূলুল্লাহ (ছ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ প্রত্যেক আদম সন্তানকেই শয়তান ছুঁয়ে দেয়, যেদিন তার মা তাকে প্রসব করে, শুধু মরিয়ম ও তাঁর ছেলে ছাড়া। (মুসলিম শরীফ #৫৯৭৮)

“ইবরাহিমের আগেই আমি আছি!”

উপরোক্ত ঘটনায়, যখন ঈসা মসীহ্‌ তাকে গুনাহ্‌গার বলে প্রমাণ করার চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন, তখন তিনি আরেকটি আশ্চর্য দাবি করে আলেমদের উত্তেজিত করলেন। তিনি বললেন যে “আমার কথামত যদি আপনারা চলেন তবে আপনারা সত্যকে জানতে পারবেন, আর সেই সত্যই আপনাদের মুক্ত করবে” (ইউহোন্না ৮:৩১-৩২)। ইহুদীরা রেগে উত্তর দিলেন যে তারা ইবরাহিমের অনুসারী। তখন ঈসা মসীহ্‌ তাদের বললেন, “ইবরাহিম আমারই দিন দেখবার আশায় আনন্দ করেছিলেন” (ইউহোন্না ৮:৫৬)। ইহুদী নেতারা তাঁকে বললেন, “তোমার বয়স এখনও পঞ্চাশ বছর হয় নি, আর তুমি কি ইবরাহিমকে দেখেছ?” ঈসা তাঁদের বললেন, “আমি আপনাদের সত্যি বলছি, ইবরাহিম জন্মগ্রহণ করবার আগে থেকেই আমি আছি।” (ইউহোন্না ৮:৫৭,৫৮)। এই কথা শুনে সেই নেতারা তাঁকে মারবার জন্য পাথর কুড়িয়ে নিলেন, কিন্তু ঈসা সেখান থেকে চলে গেলেন।

আবারও দেখা যায় ঈসা মসীহ্‌র এই দাবি আশ্চর্যজনক। তিনি শুধু ইবরাহিমের আগে ছিলেন না বরং তিনি এই-ও বলেছিলেন যে ইবরাহিমের আগে “আমি আছি”। এই কথার অর্থ আমরা কিছুক্ষণ পরে বিশ্লেষণ করব, কিন্তু তার আগে আমরা ঈসার অন্যান্য কিছু দাবি দৃষ্টিপাত করব।

নিজের বিষয়ে ঈসার দাবিগুলো

এর মধ্যে আমরা মসীহের কেরামতী কাজ, কর্তৃত্ব এবং স্বভাব দেখেছি। এখন তার নিজের বিষয়ে মসীহের কিছু দাবি আমরা দেখব। অন্যান্য বিষয়ে ঈসা যেমন অদ্বিতীয়, তেমনই এই ক্ষেত্রেও ঈসা মসীহ্‌র দাবিগুলো অনন্য এবং অদ্বিতীয়, অন্যান্য মানুষ থেকে পুরোপুরি আলাদা। তাই সংক্ষেপে সেই দাবিগুলো আমরা দেখব এখন।

দুনিয়ার নূর

ঈসা মসীহ্‌ বলেছিলেন, “আমিই দুনিয়ার নূর। যে আমার পথে চলে সে কখনও অন্ধকারে পা ফেলবে না, বরং জীবনের নূর পাবে” (ইউহোন্না ৮:১২)। মূলত ঈসা মসীহ্‌ এখানে বলছে যে আল্লাহ্‌র পথে কেউ জীবন যাপন করতে চাইলে তাঁর শিক্ষা অনুসরণ করতে হবে।

আল্লাহ্‌ কাছে যাওয়ার রাস্তা

প্রায় একই পরিস্থিতিতে কিন্তু কিছুক্ষণ পরে ঈসা মসীহ্‌ তার সাহাবীদের জুলুমের সহ্য করার জন্য প্রস্তুত করছিলেন। তিনি তাদের বললেন যেন তারা অস্থির না হয়, কারণ বেহেশতের কাছে তাঁকে তুলে নেওয়া হবে এবং তিনি তাদের জন্য বেহেশতে জায়গা প্রস্তুত করে কিয়ামতে আবার ফিরে এসে তাদেরকে বেহেশতে নিয়ে যাবেন। তিনি শেষে বলেছিলেন, “আমি কোথায় যাচ্ছি তার পথ তো তোমরা জান” (ইউহোন্না ১৪:৪)। কিন্তু একজন সাহাবী তাকে উত্তর দিলেন, “হুজুর, আপনি কোথায় যাচ্ছেন তা-ই আমরা জানি না, তবে পথ কি করে জানব?” হযরত ঈসা তাকে বললেন, “আমিই পথ, সত্য আর জীবন। আমার মধ্য দিয়ে না গেলে কেউই পিতার কাছে যেতে পারে না” (ইউহোন্না ১৪:৫,৬)। তিনি যে শুধু আল্লাহ্‌র কাছে যাওয়ার একটা বিকল্প পথ সেই কথা বলা হয় নি, বরং তিনি আল্লাহ্‌র কাছে যাওয়ার একমাত্র পথ, তাই হযরত ঈসা মসীহ্‌ বলেছেন।

তাঁকে বিশ্বাস করে জীবন পাওয়া

হযরত ঈসা যখন মৃত লাসারকে জীবন দিয়েছিলেন তখন তিনি আরেকটি আশ্চর্য দাবি করেছিলেন। লাসারের গ্রামে যাওয়ার রাস্তায় তিনি লাসারের বোন মার্থার সঙ্গে আলোচনা করছিলেন—

মার্থা ঈসাকে বললেন, “হুজুর, আপনি যদি এখানে থাকতেন তবে আমার ভাই মারা যেত না। কিন্তু আমি জানি, আপনি এখনও আল্লাহ্‌র কাছে যা চাইবেন আল্লাহ্ তা আপনাকে দেবেন।” ঈসা তাঁকে বললেন, “তোমার ভাই আবার জীবিত হয়ে উঠবে।” তখন মার্থা তাঁকে বললেন, “আমি জানি, শেষ দিনে মৃত লোকেরা যখন জীবিত হয়ে উঠবে তখন সেও উঠবে।” ঈসা মার্থাকে বললেন, “আমিই পুনরুত্থান ও জীবন। যে আমার উপর ঈমান আনে সে মরলেও জীবিত হবে। আর যে জীবিত আছে এবং আমার উপর ঈমান আনে সে কখনও মরবে না। তুমি কি এই কথা বিশ্বাস কর?” (ইউহোন্না ১১:২১-২৬)

এখানে হযরত ঈসা বলেছিলেন যে তার উপর কেউ ঈমান আনলে এবং তাকে অনুসরণ করলে তিনি কখনও দোজখে যাবে না বরং অনন্তকাল আল্লাহ্‌র কাছে থাকবে।

ক্লান্তদের জন্য বিশ্রাম

“তোমরা যারা ক্লান্ত ও বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছ, তোমরা সবাই আমার কাছে এস; আমি তোমাদের বিশ্রাম দেব। আমার জোয়াল তোমাদের উপর তুলে নাও ও আমার কাছ থেকে শেখো, কারণ আমার স্বভাব নরম ও নম্র।” (মথি ১১:২৮-৩০)

মানুষ বিভিন্ন ধরণের বোঝা বহন করে এবং বিশ্রামের জন্য আকাঙ্ক্ষা করে। তার অনুসারীদের জন্য হযরত ঈসা ঠিক তাই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন।

জীবন্ত রুটি

সেই হাজার হাজার মানুষদের অলৌকিক ভাবে খাওয়ানোর ঘটনার পরে হযরত ঈসা নিজের বিষয়ে আরেকটি দাবি করেছিলেন। সেদিন যারা খাবার পেয়েছিল তাদের মধ্যে কিছু লোক পরে ঈসার কাছে ফিরে এসেছিল। কিন্তু অন্তন জীবনের বিষয়ে শিক্ষা পাওয়ার জন্য তারা মসীহের কাছে আসেন নি বরং শুধু পেট ভরে পাওয়ার জন্য এসেছিলেন। তাদের ভুল উদ্দেশ্য দেখিয়ে দিয়ে ঈসা বলেছিলেন,

“আমিই সেই জীবন-রুটি। যে আমার কাছে আসে তার কখনও খিদে পাবে না। যে আমার উপর ঈমান আনে তার আর কখনও পিপাসাও পাবে না।” (ইউহোন্না ৬:৩৫)

অন্য ভাবে ঈসা মসীহ্‌ একই কথা বলেছিলেন। তিনি বলছিলেন যে যারা তার কাছে আসে তারা অনন্তকাল বেহেশতে থাকতে পারবে এবং সেখানে তাদের সব প্রয়োজনীয় জিনিস তাদের জন্য জোগাড় করা হবে।

তাহলে এগুলি হল নিজের বিষয়ে হযরত ঈসার কিছু দাবি। বিভিন্ন কথার চিত্র এবং প্রতীক দিয়ে সেগুলি একই সত্য প্রকাশ করে যে, আল্লাহ্‌র কাছে যাওয়ার রাস্তা হল ঈসা মসীহ্‌। যারা তাঁকে অনুসরণ করে তাদের খিদে, তৃষ্ণা, মৃত্যু বা গুনাহের ভার ভয় করতে হয় না।

বেহেশতের নিশ্চয়তা

এখন নিজের বিষয়ে ঈসার বিভিন্ন দাবি থেকে সরে গিয়ে আমি দেখাতে চাই কীভাবে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে তাঁর অনুসারীদের বেহেশতের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। যেমন সূরা আলে-‘ইমরানে বলা হয়েছে—

“স্মরণ কর, যখন ফিরিশ্‌তাগণ বলিল, ‘হে মার্‌ইয়াম! নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তোমাকে তাঁহার পক্ষ হইতে একটি কালেমার সুসংবাদ দিতেছেন। তাহার নাম মাসীহ্‌ মার্‌ইয়াম-তনয় ‘ঈসা, সে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত এবং সান্নিধ্যপ্রাপ্তগণের অন্যতম হইবে।” (সূরা আলে-‘ইমরান ৩:৪৫)

এই আয়াতের বিভিন্ন বিস্ময়কর বিষয়ের মধ্যে একটি হল যে এই দুনিয়ায় এবং আখিরাতে (কিয়ামত এবং কিয়ামতের পরে) ঈসা সম্মানিত হবে। কোরআন শরীফে অন্যান্য নবীরা খুলাখুলি ভাবে স্বীকার করেন যে কিয়ামতের পর তাদের কি হবে সেটা তারা জানেন না (যেমন সূরা আহ্‌কাফ ৪৬:৯)। কিন্তু ঈসার ক্ষেত্রে কোন অনিশ্চয়তা নাই। কিয়ামতে আল্লাহ্‌ তাকে সম্মান দিবেই। আবার তার অনুসারীদের ক্ষেত্রেও কোন অনিশ্চয়তা নাই কারণ ইঞ্জিলে বলা হয়েছে যে কিয়ামতে ঈসা মসীহ্‌ তাদেরকে বেহেশতে তাঁর সঙ্গে নিয়ে যাবেন।

হযরত ঈসার বিভিন্ন নাম ও উপাধি

মসীহ্‌

শেষে ঈসার শুধু আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখা দরকার। তার বিভিন্ন নাম বা উপাধি দেখা দরকার। প্রথমে আমরা ‘মসীহ্‌’ শব্দটা বিশ্লেষণ করে দেখব। সেটা আসলে কোন নাম না বরং একটা উপাধি যেটা ইঞ্জিল, কোরআন এবং আগেকার কিতাবে পাওয়া যায়। ইঞ্জিলে অনেক জায়গায় এটা ঈসার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় এবং কোরআনে সূরা আলে-‘ইমরান ৩:৪৫ এবং আন-নিসা ৪:১৭১ আয়াতে তার এই উপাধি দেখা যায়। “মসীহ্‌” শব্দের অর্থ “মনোনীত” বা “অভিষিক্ত”। আগেকার কিতাবে আল্লাহ্‌ ওয়াদা করেছিলেন যে শয়তানকে পরাজিত করার জন্য এবং শয়তানের কাজকর্ম বন্ধ করে আল্লাহ্‌র রহমত মানব জাতির কাছে পৌঁছানোর জন্য একজনকে পাঠানো হবে। এই ওয়াদাকৃত ব্যক্তিকে বলা হয়েছে ‘মসীহ্‌’, বা আল্লাহ্‌ মনোনীত ব্যক্তি।

‘ঈসা’ নামের অর্থ

তার দ্বিতীয় নাম “ঈসা” তার মা এবং বিপিতা তাকে দিয়েছিলেন। কিন্তু আসলে সেটা তাদের পছন্দ নাম না বরং ঈসার জন্মের আগে একজন ফেরেশতা বিবি মরিয়মের কাছে প্রকাশ করেছিলেন যে পাক-রূহের কুদরতীতে যে সন্তান হবে তার নাম “ঈসা” রাখা হবে। এই নাম দেওয়ার কারণ নিয়ে কোন সন্দেহ নাই, কারণ ফেরেশতা এইভাবে বলেছিলেন—

“তুমি তাঁর নাম ঈসা রাখবে, কারণ তিনি তাঁর লোকদের তাদের গুনাহ্ থেকে নাজাত করবেন।” (মথি ১:২১)

হয়ত আমরা প্রশ্ন করব, ঈসার নামের সাথে লোকদের নাজাত দেওয়ার কী সম্পর্ক আছে? আল্লাহ্‌র কালামে নবীদের নামের অর্থ খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেকসময়ে আল্লাহ্‌ মানুষকে ডাক দেওয়ার সময়ে তাদের একটি নতুন নাম দিয়েছিলেন – যেমন হযরত ইবরাহিম বা হযরত ইয়াকুব। তাদের নামে তাদের ভূমিকা বা কাজ জানা যায়। যেমন ‘আদম’ মানে ‘মানুষ’, ‘ইবরাহিম’ মানে ‘অনেক জাতির পিতা’, ‘মূসা’ মানে ‘বের করে আনা’ (মিসরের গোলামি থেকে তিনি বনি-ইসরাইল বের করে এনেছিলেন), ইত্যাদি। হযরত ঈসার ক্ষেত্রে, তার নামে তার জীবনের কাজ জানা যায়, কারণ ‘ঈসা’ শব্দ হিব্রু থেকে আসে এবং হিব্রুতে এর অর্থ ‘নাজাত করা’ বা ‘নাজাতদাতা’। তাই ‘ঈসা’ এবং ‘মসীহ্‌’ এই দুই নাম যোগ করলে অর্থ হয় “মনোনীত নাজাতদাতা”।

আল্লাহ্‌র কালাম

উপরোক্ত দুই নাম যথেষ্ট আশ্চর্যজনক। কিন্তু ঈসার তৃতীয় নাম আরও বেশী বিস্ময়কর। সেটা “কালিমাতুল্লাহ্‌” বা “আল্লাহ্‌র বাণী”। এই ক্ষেত্রেও ইঞ্জিল এবং কোরআন উভয় কিতাবে এই উপাধি ঈসার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। কোরআনে সূরা আলে-‘ইমরান ৩:৩৯,৪৫; সূরা নিসা ৪:১৭১, এবং সূরা মার্‌ইয়াম ১৯:৩৪ আয়াতে এই উপাধি পাওয়া যায়। যেহেতু এটা হযরত ঈসার সবচেয়ে জটিল নাম, আমি একটি ছোট নকশা দিয়ে এর অর্থ বুঝিয়ে দিব। এই নক্‌শার মাঝখানে আমি “আল্লাহ্‌” লিখব। এখন, আল্লাহ্‌র বিষয়ে আমরা কী জানি? আমরা যেনেছি যে আল্লাহ্‌ এক, তিনি অসৃষ্ট এবং চিরন্তন।

নক্‌শা #১
 

মজার বিষয়, কোন কিতাবে আল্লাহ্‌র অস্তিত্বের পক্ষে কোন ব্যাখ্যা বা সমর্থন দেওয়া হয় না, সেটা কোন প্রমাণ ছাড়াই স্বীকার করে নেওয়া হয়। তাই তৌরাত শরীফের প্রথম খণ্ড পয়দায়েশে প্রথম আয়াতে শুরু হয়: “সৃষ্টির শুরুতেই আল্লাহ্ আসমান ও জমীন সৃষ্টি করলেন।” আল্লাহ্‌ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, তার উৎপত্তি সম্বন্ধে কোন তত্ত্ব দেয় না, চিরকাল থেকে চিরকাল তিনি সবসময় বিদ্যমান। নবীদের কিতাবে তিনি নিজেকে এইভাবে বর্ণনা করেছেন—

মাবুদ বলছেন, “আমার চিন্তা তোমাদের চিন্তার মত নয়, আমার পথও তোমাদের পথের মত নয়। আসমান যেমন দুনিয়ার চেয়ে অনেক উঁচু, তেমনি আমার পথ তোমাদের পথের চেয়ে, আমার চিন্তা তোমাদের চিন্তার চেয়ে অনেক উঁচু। (ইশাইয়া ৫৫:৮-৯)

আল্লাহ্‌তা’আলা আমাদের অনেক ঊর্ধ্বে, তাকে আমরা কখন পুরোপুরি ভাবে উপলব্ধি করতে পারব না।

আল্লাহ্‌-পাক আবার সবকিছুর স্রষ্টা। তৌরাত শরীফের শুরুতে আসমান-জমীন সৃষ্টির একটি বর্ণনা দিয়ে শুরু হয়, এবং সৃষ্টির চূড়ায় আল্লাহ্‌ আদম এবং হাওয়াকে সৃষ্টি করেছিলেন যেন তাঁরা সৃষ্টির দেখাশোনা করেন এবং আল্লাহ্‌র সঙ্গে যোগাযোগ-সম্বন্ধ রাখেন। আমাদের নক্‌শায় আমরা পৃথিবীর সৃষ্টির প্রতীক হিসেবে একটা বাঁকা লাইন আঁকব। এই বাঁকা লাইনের উপরে আমরা একটি মানুষের আকৃতি আঁকাব, সেই আশরাফুল মাখলুকাত।

নক্‌শা #২

 
আগে যেমন বলেছি, আল্লাহ্‌র বিষয় জানার জটিলতা হচ্ছে যে তিনি আমাদের অনেক ঊর্ধ্বে, আমাদের নাগালের বাইরে। সৃষ্টির দিকে দেখে আমরা তার ক্ষমতা, জ্ঞান এবং সৃজনশক্তি সম্পর্কে একটু বুঝতে পারি। কিন্তু তাও অনেক কিছু অস্পষ্ট থাকে। বর্তমান বিশ্বে আমরা ভাল-খারাপ উভয়ই দেখি। তাই আল্লাহ্‌ কি ভাল না খারাপ না দুটোই? শুধুমাত্র সৃষ্টি থেকে এর উত্তর যানা যাবে না। আরও জটিল হয়ে যায় যেহেতু আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রীয় দিয়ে আল্লাহ্‌কে উপলব্ধি করা যায় না। আমরা তাকে দেখতে পারি না, শুনতে পারি না। তাঁকে ছোঁয়া যায় না বা তার স্বাদ নেওয়া যায় না। তাই এই সৃষ্টি ছাড়া আল্লাহ্‌র বিষয় আমরা কীভাবে শিখতে পারি? সুস্পষ্ট এবং সহজ উত্তরটা হল আল্লাহর কালাম।

আল্লাহ্‌ তার লিখিত কালাম দিয়ে যোগাযোগ করেন

সকল কিতাবী লোক আল্লাহ্‌ কালাম সম্মান করে কারণ সেটা আল্লাহ্‌কে জানার প্রধান মাধ্যম। যদিও সৃষ্টি থেকে আমরা আল্লাহ্‌র বিষয়ে অনেক মূল্যবান বিষয় শিখতে পারি, তার কালাম থেকে আমরা তার কাজ এবং পরিচয় সম্পর্কে আরও অনেক স্পষ্টভাবে জানতে পাই। জবুর শরীফে যেমন বলা হয়েছে—

“তোমার কালাম প্রকাশিত হলে তা আলো দান করে;
তা সরলমনা লোকদের বুঝবার শক্তি দেয়।” (জবুর শরীফ ১১৯:১৩০)

আল্লাহ্‌র কালাম থেকে আমরা তার পবিত্রতা এবং ন্যায়বিচার সম্বন্ধে জানতে পারি। আমরা দেখি যে আল্লাহ্‌ সবরকম গুনাহ্‌, ছলনা এবং ভণ্ডামি ঘৃণা করেন। আমরা আল্লাহ্‌র বিচার সম্বন্ধে জানতে পারি, এবং যেসব গুনাহ্‌গার মানুষ তওবা করে তার কাছে ফিরে আসে তাদের প্রতি আল্লাহ্‌র রহমত এবং দয়া সম্বন্ধে আমরা তার কালাম থেকে জানতে পারি। তাই আমাদের নক্‌শায় “আল্লাহ্‌” শব্দের পাশে আমি “আল্লাহ্‌র কালাম” লিখব।

নক্‌শা #৩

 

তবুও, শুধু তার কালামের মাধ্যমে আল্লাহ্‌কে বোঝার কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। উদাহরণস্বরূপ, যার সঙ্গে আপনি চিঠি বিনিময় করেছিলেন কিন্তু সামনাসামনি দেখা হয় নি তাকে স্পষ্টভাবে জানার চেষ্টা কঠিন হয়। অনেক দিক দিয়ে আমরা তাদেরকে জানি, কিন্তু একটি ব্যক্তিগত সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা বা আন্তরিকতার অভাব রয়ে যায়। এই ঘনিষ্ঠতার ব্যবস্থা করার জন্য আল্লাহ্‌ আরেক ধাপ এগিয়ে গেলেন।

অসৃষ্ট কালাম

প্রত্যেক মুসলমানের উপর ‘আল্লাহ্‌র চিরন্তন কালাম’ ধারণাটি স্বীকার করা ফরজ; তাঁর চিরন্তন এবং চিরস্থায়ী বাক্য এবং আত্ম-প্রকাশ যেটা গাইর-মাখ্‌লুক বা অসৃষ্ট। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী নাজিলকৃত কিতাবগুলো হল এই অসৃষ্ট কালামের একটি প্রকাশ, যার কারণে সেগুলোকে বলা হয়كلام الله ‘কালাম-আল্লাহ্‌’। যখন নবীদের মাধ্যমে কিতাব নাজিল হল তখন আল্লাহ্‌ চিরন্তন কালাম লিখিত রূপ ধারণ করল এবং কাগজ-কালির আকৃতিতে কিতাব হিসেবে ছড়িয়ে গেল।

হযরত ঈসার অদ্বিতীয় বিষয় হল যে কোরআনে এবং ইঞ্জিলে তাকেই বলা হয় মানুষ-আকৃতিতে ‘কালাম-আল্লাহ্‌’, আল্লাহ্‌র জীবন্ত ‘বাণী’ বা আল্লাহ্‌র নিজের আত্মপ্রকাশ। কোরআন এবং ইঞ্জিলে ঈসাকে ‘আল্লাহ্‌র কালাম’ বলা হয়েছে—

মার্‌ইয়াম-তনয় ‘ঈসা মসীহ্‌ তো আল্লাহ্‌র রাসূল এবং তাঁহার বাণী, যাহা তিনি মার্‌ইয়ামের নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন ও তাঁহার আদেশ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ্‌ ও তাঁহার রাসূলগণে ঈমান আন” (সূরা নিসা ৪:১৭১)

এই আয়াতে মসীহ্‌কে ‘আল্লাহ্‌র কালাম’ বা আল্লাহ্‌র বাক্য বলা হয়েছে। এবং ইসলামে যেমন বলা হয় আল্লাহ্‌র লিখিত বাণী অর্থাৎ তার কিতাবগুলো সৃষ্টির আগে থেকেই ছিল তেমনই ইঞ্জিলে বলা হয়েছে যে আল্লাহ্‌র জীবন্ত কালাম হযরত ঈসা সৃষ্টির আগে থেকেই ছিলেন—

প্রথমেই কালাম ছিলেন, কালাম আল্লাহ্‌র সংগে ছিলেন এবং কালাম নিজেই আল্লাহ্ ছিলেন।

“প্রথমেই কালাম ছিলেন, কালাম আল্লাহ্‌র সঙ্গে ছিলেন … এবং সব কিছুই সেই কালামের দ্বারা সৃষ্ট হয়েছিল, আর যা কিছু সৃষ্ট হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে কোন কিছুই তাঁকে ছাড়া সৃষ্ট হয় নি।” (ইউহোন্না ১:১,৩)

“সমস্ত সৃষ্টির আগে তিনিই ছিলেন … কারণ আসমান ও জমীনে, যা দেখা যায় আর যা দেখা যায় না, সব কিছু তাঁর দ্বারা সৃষ্ট হয়েছে … তিনিই সব কিছুর আগে ছিলেন এবং তাঁরই মধ্য দিয়ে সব কিছু টিকে আছে।” (কলসীয় ১:১৫,১৭)

তাই ঈসার মধ্য দিয়ে সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে এবং টিকে থাকে। তৌরাত শরীফ থেকে আমরা জানি যে শুধু তাঁর কথা দ্বারা আল্লাহ্‌ শূন্য থেকে সবকিছু সৃষ্টি করেছিলেন। كن فيكون কুন ফায়াকূন – আল্লাহ্‌ কথা বলেছিলেন এবং তাঁর সেই কথার দ্বারা সবকিছু সৃষ্টি হয়ে গেল। কিন্তু মসীহ্‌ তো সেই কালামের ফল নয় বরং তিনিই সেই সৃজনশীল কালাম, তিনি নিজেই সেই ‘কুন-ফায়াকূন’। ইঞ্জিল শরীফ থেকে আমরা জানি যে ঈসা মসীহ্‌ ছিলেন সেই কালাম যার দ্বারা আল্লাহ্‌ সবকিছু সৃষ্টি করেছিলেন এবং যার দ্বারা সবকিছু টিকে থাকে।

এই পূর্বজীবী কালাম মানুষের আকৃতি ধারণ করল এবং আমাদের মধ্যে বাস করল। তিনি ছিলেন নবী ঈসা মসীহ্‌। এটা আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি?

আমাদের বোধশক্তির বাইরে

হযরত ঈসা সম্পর্কে কিতাব যা বলে তা বোঝা কঠিন কারণ তা আমাদের সাধারণ অভিজ্ঞতার বাইরে যায়। কিন্তু তবুও যারা এই আয়াতগুলো অধ্যয়ন করেছেন তাদের মধ্যে ঈসা মসীহ্‌র পরিচয় নিয়ে একটি ঐকমত দেখা দিয়েছে। সহজ ভাষায়, তিনি জীবন্ত আল্লাহ্‌র বাণী। নবীদের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র নাজিলকৃত বিভিন্ন কিতাব হল আল্লাহ্‌ লিখিত কালাম। ঈসা হল মানব রূপে আল্লাহ্‌র জীবন্ত কালাম।

আল্লাহ্‌র জীবন্ত কালাম

একটি ‘বাণী’ বা ‘কথা’ হল যোগাযোগের মাধ্যম। যখন মানুষ মতবিনিময় করতে চায়, তখন তারা কী করে? তারা কথা দিয়ে কথোপকথন করে। আমি যদি চুপ করে নিরবে বসে থাকি, তাহলে আমার চিন্তা কেউ জানতে পারবে না। শুধুমাত্র মুখ খুলে কথা বললে আমার ভেতরের চিন্তাগুলো প্রকাশ পাবে। আমাদের নকশায় আমি এখন ‘আল্লাহ্‌র কালাম’ বোঝানোর জন্য আরেকটি জিনিস আঁকাব:

নক্‌শা #৪

 

একই ভাবে ঈসা মসীহ্‌ আল্লাহ্‌র ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করে। আমরা যখন হযরত ঈসার বিভিন্ন ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব দেখি, আমরা আল্লাহ্‌র ক্ষমতা এবং কর্তৃত্বের প্রতিচ্ছায়া দেখি।

তাই আমাদের নক্‌শায় আমরা দেখি যে যদিও মানুষের পঞ্চ ইন্দ্রীয় দ্বারা আমরা আল্লাহ্‌র সম্পর্কে বেশি কিছু উপলব্ধি করতে পারি না। তার সৃষ্টির এবং লিখিত কালাম দ্বারা আমরা আল্লাহ্‌র বিষয়ে আরও অনেক কিছু জানতে পায়। কিন্তু আল্লাহ্‌র লিখিত কালাম অনুযায়ী, হযরত ঈসা হল আল্লাহ্‌ জীবন্ত বাণী যিনি মানুষ রূপ গ্রহণ করে আমাদের মধ্যে বাস করেছিলেন এবং এইভাবে তিনি আল্লাহ্‌র ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করেছিলেন। তাঁরই দ্বারা আমরা আল্লাহ্‌র বিষয়ে সবচেয়ে বেশী শিখতে পারি।

আমরা দেখেছি যে ইউহোন্না ১৪ অধ্যায়ে ঈসা মসীহ্‌ বলেছিলেন,

“আমিই পথ, সত্য আর জীবন। আমার মধ্য দিয়ে না গেলে কেউই পিতার কাছে যেতে পারে না।” (ইউহোন্না ১৪:৬)

এতে ঈসার এক সাহাবী উত্তর দিয়ে বলল, “”হুজুর, পিতাকে আমাদের দেখান, তাতেই আমরা সন্তুষ্ট হব।” অবশ্যই তিনি যা চাইলেন সেটা অসম্ভব, কারণ আল্লাহ্‌ নিরাকার, তিনি অদৃশ্য, কেউ তাকে দেখাতে পারবে না। তবুও অদৃশ্য আল্লাহ্‌ কী রকম তা ঈসা মসীহ্‌র দ্বারা আমরা বুঝতে পারি। হযরত ঈসা উত্তর দিলেন—

“ফিলিপ, এতদিন আমি তোমাদের সংগে সংগে আছি, তবুও কি তুমি আমাকে জানতে পার নি? যে আমাকে দেখেছে সে পিতাকেও দেখেছে। তুমি কেমন করে বলছ, ‘পিতাকে আমাদের দেখান’?” (ইউহোন্না ১৪:৯)

কত আশ্চর্য একটি দাবি! অদৃশ্য আল্লাহ্‌ কী রকম হযরত ঈসা মানব রূপে প্রকাশ করে। আল্লাহ্‌র ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে এটি হল আমাদের সবচেয়ে পরিষ্কার ছবি।

যারা ঈসা মসীহ্‌র সাহাবী ছিলেন এবং আল্লাহ্‌র সেই জীবন্ত কালামের সঙ্গে যারা ছিলেন, তাদের সাক্ষ্য ইঞ্জিল শরীফে এই রকম—

সেই প্রথম থেকেই যিনি ছিলেন, যাঁর মুখের কথা আমরা শুনেছি, যাঁকে নিজেদের চোখে দেখেছি, যাঁকে ভাল করে লক্ষ্য করেছি, যাঁকে নিজেদের হাতে ছুঁয়েছি, এখানে সেই জীবন-কালামের কথাই লিখছি। সেই জীবন প্রকাশিত হয়েছিলেন। আমরা তাঁকে দেখেছি এবং তাঁর বিষয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছি। যিনি পিতার কাছে ছিলেন আর আমাদের কাছে প্রকাশিত হয়েছিলেন সেই অনন্ত জীবনের কথাই তোমাদের জানাচ্ছি। যাঁকে আমরা দেখেছি এবং যাঁর মুখের কথা আমরা শুনেছি তাঁর বিষয়েই তোমাদের জানাচ্ছি। আমরা তা জানাচ্ছি যেন তোমাদের ও আমাদের মধ্যে একটা যোগাযোগ-সম্বন্ধ গড়ে ওঠে। এই যোগাযোগ হল পিতা ও তাঁর পুত্র ঈসা মসীহ্ এবং আমাদের মধ্যে।” (১ ইউহোন্না ১:১-৩)

উপসংহার

তাহলে ঈসাকে নিয়ে বিভিন্ন কিতাবের বর্ণনা দেখার শেষে আমরা কী কী উপসংহার দিতে পারি? প্রথমত সুস্পষ্টই তিনি আল্লাহ্‌র অন্যান্য নবীদের থেকে আলাদা, তিনি অনন্য এবং ভিন্ন। এইজন্য তাকে কেন্দ্র করে এতো তর্কাতর্কি হয়। বিভিন্ন মানুষ তার বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য দেখে ভিন্ন ব্যাখ্যায় পৌঁছে আসে।

তবুও আমার মতে যে কেউ নিরপেক্ষভাবে প্রমাণগুলো যাচাই করলে তিনি অবশ্যই বিশেষ কিছু কিছু উত্তর পাবে। তিনি মসীহ্‌, অর্থাৎ গুনাহ্‌গার মানুষদের নাজাতের সুযোগ দেওয়ার জন্য আল্লাহ্‌ মনোনীত জন। তিনি আবার আল্লাহ্‌র কালাম, যিনি শুরু থেকেই আল্লাহ্‌ সঙ্গে ছিলেন, কুমারী মরিয়মের মাধ্যমে যিনি মানব রূপ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি একটি নিষ্পাপ জীবন যাপন করলেন এবং জীবিত অবস্থায় বেহেশতে আল্লাহ্‌র কাছে ফিরে গেছেন এবং সেখানে তিনি তার অনুসারীদের জন্য জায়গা প্রস্তুত করছেন। শেষে তিনি কিয়ামতে আবার দুনিয়াতে ফিরে এসে সকল মানুষের বিচার করবেন এবং বেহেশতে তার অনুসারীদের তিনি নিয়ে যাবেন।

  1. মোঃ জাকারিয়া অনূদিত সাহীহ্ মুসলিম (মীনা, ঢাকা ২০০৮), পৃষ্ঠা ৯০২.
  2. সূরা আলে-ইমরান ৩৯ আয়াত যেখানে হযরত ইয়াহিয়া (আঃ)-এর ক্ষেত্রে বলা হয়েছে “সে হবে আল্লাহ্‌র বাণীর সমর্থক” সেখানে স্পষ্টই বোঝানো হচ্ছে যে ইয়াহিয়া ঈসাকে সমর্থন করবেন, অর্থাৎ কালিমাতুল্লাহ্‌র সমর্থন করবেন। বিখ্যাত মুফাস্‌সিরে-কোরআনগণ এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত, এবং ইঞ্জিল (ইউহোন্না ১:৭,১৪) একই কথা বলে।
* * *

কোনো প্রশ্ন বা মন্তব্য থাকলে আমরা শুনতে চাই! নিচের ফর্ম দিয়ে যোগাযোগ করুন:

Enable javascript in your browser if this form does not load.

Leave a Reply

Your email address will not be published.